বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

পর্যটন শিল্প কোন পথে

জামিঊল আহমেদ:
অভ্যন্তরীণ কিছুটা হলেও, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পর্যটন উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছে যেতে পারেনি। ফলে অর্জিত হয়নি আশানুরূপ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। তবে এটাও ঠিক, এসব অর্জনের জন্য যে সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা দরকার তাও আমরা করতে পারিনি। এতে পর্যটন সব সময়ই চলেছে লক্ষ্যহীনভাবে। তাই ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হয়েছে ক্রমাগতভাবে। এসব পশ্চাৎপদতার পেছনে কাজ করেছে, সরকারি এবং বেসরকারি খাতের ব্যর্থতা। তারপরও পর্যটন শিল্পের যতটুকু উন্নতি হয়েছে, তার প্রায় সবটুকুই বেসরকারি খাতের একক প্রচেষ্টায়। বিশ্বজনীনভাবে পর্যটন শিল্পের রয়েছে চারটি প্রধান খাত অর্থাৎ যানবাহন, আবাসন, খাবার ও পানীয় এবং বিনোদন। তার মধ্যে যানবাহনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আকাশ, স্থল এবং জলযান। সেখান থেকে আকাশ পথের যান অর্থাৎ বেসামারিক বিমান পরিবহনের নামে মন্ত্রণালয় গঠন করে, তার লেজের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে পর্যটনকে। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, পর্যটন শিল্প সম্পর্কে আমাদের দীনতা ও অজ্ঞতা এবং এর সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যর্থতার মাত্রা কতটুকু।

বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিজের বলতে কিছুই থাকে না। ফলে বিশাল ও বিস্তৃত এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য অর্থ, ভূমি, বন ও পরিবেশ, সংস্কৃতি, স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্থানীয় সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ইত্যাদি প্রায় কোনো না কোনো মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব মন্ত্রণালয়কে উন্নয়ন সহযোগী বা সাথী করে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা, শুধুমাত্র একজন পর্যটনমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব হয় না বিধায় পৃথিবীর কোনো দেশেই রাষ্ট্রপতি এবং বিশেষ করে সরকারপ্রধানের নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া পর্যটনের উন্নয়ন সম্ভব হয়নি এবং হবেও না। পর্যটনের জন্য থাকা চাই, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো। যেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে একটি যথার্থ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ, যা সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করবে। অথচ সেই পুরাতন ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন’কে এতদিন সাক্ষী গোপাল বানিয়ে রেখে একে ফোকলা করা হয়েছে। অর্থাৎ যা কিছু করার ক্ষমতা তার ছিল, তা কেড়ে নিয়ে নবগঠিত ‘বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড’-এর পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে জনবল, সম্পদ, অভিজ্ঞতা সবই রয়ে গেছে পর্যটন করপোরেশনের কাছে আর প্রায় সব ক্ষমতা চলে গেছে পর্যটন বোর্ডের কাছে। আবার পর্যটন বোর্ডের না আছে জনবল, অভিজ্ঞতা ও সম্পদ আর না আছে স্ব-স্বাধীনতা। ফলে কাজের কাজ কিছু না হলেও, চরদখলের মতো পদ, তথা ক্ষমতা দখলে আমলারা জয়ী হতে পেরেছেন। এতে পর্যটন শিল্প বেসরকারি খাতের আরও নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই কারসাজি এক সময় খোলাসা হওয়ার পর চতুর আমলারা ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন অধ্যাদেশ-১৯৭২’ সংশোধনীর নামে ‘২০২২ সালের ১১ নং আইন’ দ্বারা যা করেছেন, তা অনেকটা তুঘলকি কাণ্ডের মতো একটা কিছু বলা চলে। পর্যটনের ফায়দা কী হবে, তা বিবেচনায় না নিয়ে তারা নিজেদের জন্য আরও কর্মক্ষেত্র ও পদপদবির ইন্তেজাম করেছেন ঠিকই। যেমন পর্যটন করপোরেশনে একজন চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন পরিচালক নিয়ে বিদ্যমান যে ‘পরিচালক পর্ষদ’ রয়েছে, সেটিকে বহাল রেখেই নতুন একজন প্রেসিডেন্টকে প্রধান করে আরেকটি ‘পরিচালক পর্ষদ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে আরও অন্তত আটজন যুগ্ম-সচিব অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

পর্যটন শিল্পের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য চাই প্রয়োজনীয় আইন। তাও আমাদের পর্যাপ্ত নেই; এমনকি বহু চেষ্টার পরও একক পর্যটন আইনকে শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আবার বহু বছর বলার পর হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ট্রাভেল এজেন্সি আইনের মতো পুরনো আইনগুলো যুগোপযোগী করতে গিয়ে, অভিজ্ঞজনের মতামত এবং আন্তর্জাতিকতার ধার না ধেরে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে আরও লেজেগোবরে করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত হোটেল ও রেস্তোরাঁ শ্রেণিকরণকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিংবা সব ধরনের আবাসন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধীকরণ ও শ্রেণিকরণ জটিলতার নিরসন করতে না পারার ফলে, পর্যটন সেবার নিবন্ধীকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণে ‘মান সম্পন্ন পর্যটন সেবা’ বা কিউটিএস পদ্ধতির প্রবর্তন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

বহু বছরের দাবির বিপরীতে ইদানীং সামান্য পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ হওয়ার পরও, তা শুধুমাত্র পরিকল্পনার অভাবে কাজে লাগানো যায়নি। তবে এটা সত্য, পর্যটন থেকে প্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়ার কোনো সুযোগ এখন পর্যন্ত আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। পারিনি পর্যটক আগমন ও নির্গমনের সঠিক সংখ্যা নিরূপণের কোনো ব্যবস্থা করতে। গোটা দুনিয়ায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) ব্যবহার করে তাবৎ পর্যটন পরিসংখ্যান, এমনকি জিডিপি-তে পর্যটনের অবদান ইত্যকার সবকিছুই এখন পাওয়া সম্ভব। অথচ এ কাজটি না করতে পারায়, পর্যটন পরিসংখ্যান নিয়ে আমরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এখনো অন্ধকারে। শুধু কি তাই, পর্যটনের মতো বিশাল ও বিস্তৃত একটি শিল্প এত বছর ধরে চলছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত ছাড়া। অথচ এজন্য থাকার কথা পর্যটনের যাবতীয় তথ্য-উপাত্তসহ ‘জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার’ বা ন্যাশনাল ট্যুরিজম ডাটা বেস। যা না থাকলে সঠিক শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ, অধ্যয়ন, গবেষণা, প্রচার-প্রচারণা, লেখালেখি, সংবাদ প্রচার এমনকি মানসম্পন্ন পর্যটন পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করা তথা সুষ্ঠুভাবে ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব হয় না। পর্যটনের মূল যে শক্তি অর্থাৎ পর্যটন সম্পদের পর্যাপ্ততা এবং মানব সম্পদের সহজলভ্যতা, তা কাজে লাগানোর জন্য পর্যটন পণ্যের উন্নয়ন, প্রচার ও প্রসারে একদিকে যেমন সঠিক পরিকল্পনা দরকার অন্যদিকে মানসম্পন্ন ও দক্ষ জনশক্তি জরুরি। অথচ পরিকল্পনা একেবারেই নাজুক অবস্থায়। তবে মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিক দিক থেকে সুখবর থাকলেও, মানের দিক থেকে এগুলো পিছিয়ে। তাই চাকরির যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও, একদিকে প্রশিক্ষণার্থীদের বেকার থাকতে হচ্ছে অন্যদিকে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশ থেকে দক্ষ লোকবল নিয়ে আসতে হচ্ছে। যে কারণে দেশ মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে। এজন্য ছাত্র, শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ এবং চাকরিদাতা এদের মধ্যে বিরাজিত সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসন, চাকরি নিশ্চিতকরণ, সার্বিক সমন্বয় সাধন, পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, ন্যাশনাল সার্টিফিকেশন ইত্যাদি কাজের জন্য সরকারি কোনো বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ না

থাকায়, সবকিছু জট পাকিয়ে আছে। অপরদিকে, পর্যটন উন্নয়নের পূর্ব শর্ত যে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা তা কার্যত অনুপস্থিত থাকায়, বিভিন্ন সময়ে যতটুকু কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে, তা বিফলে গেছে। এই উপলব্ধি থেকেই, তা পুষিয়ে নিতে ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেও এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তাই বহু বছরের দাবি ও প্রত্যাশা পূরণকল্পে, পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভারত ও ফ্রান্সের একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান ‘আইপি গ্লোবাল’ পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব পায়। তবে, তারা কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে, বিষয়টি সার্বিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঐ কমিটির তদন্তে খসড়া মহাপরিকল্পনাটির ব্যাপক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতি ধরা পড়ায় পরামর্শ দেওয়া হয়।

অথচ কোনো এক অদৃশ্য কারণে এবং বিশেষ করে প্রশাসনের লোকজন তথা আমলাদের গড়িমসিতে ২০২৪ সালে সরকারের ক্ষমতা হারানো পর্যন্ত, পরামর্শ আমলে নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে এসে সরকারকে দিয়ে এর দফারফা তথা হিল্লা করার কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। এর সঙ্গে তড়িঘড়ি করে ঘষামাজার মাধ্যমে মৃতপ্রায় জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলকে সক্রিয় করার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন যে কোনো সময় নতুন সরকারকে দিয়ে, মহাসংকটে থাকা ভঙ্গুর মহাপরিকল্পনাটি অনুমোদন করানো হবে। এর অর্থ দাঁড়াবে, একটি বিকলাঙ্গ পর্যটন মহাপরিকল্পনা ভূমিষ্ঠ হবে। এতে আমলাদের জয় এবং পর্যটনের পরাজয় হবে। প্রকারান্তরে সরকারকে ব্যর্থতার দায়ভাগ নিতে হবে। তার সঙ্গে রাষ্ট্র তথা জনগণের প্রায় ৩০ কোটি টাকা তথা অর্থ এবং সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের অগ্রযাত্রা বিলম্বিত তথা মূল্যবান সময় নির্ঘাত জলে যাবে। এতে অসহায় ও অবহেলিত পর্যটন শিল্পকে আবারও পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা ছাড়াই ভঙ্গুর অবস্থায় দিন কাটাতে হবে। অথচ এতসব কিছু পরিহার করার জন্য বিকল্প পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে অর্থ, সময়, বিড়ম্বনা এবং পর্যটনের ক্ষতি সবই রক্ষার পাশাপাশি পর্যটনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে যা করা দরকার এমন একটা কিছু করা যেত। আসলে যতদিন পর্যন্ত একটি সরকার আন্তরিক না হবে এবং তার সঙ্গে ‘আমলাতন্ত্রের ইচ্ছায় নয় বরং পর্যটনের নিয়মের মধ্যে থেকে পরিকল্পনামাফিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উন্নয়ন কাজ করতে হবে’ মর্মে উপলব্ধি না করবে ততদিন পর্যন্ত দেশে পর্যটন শিল্পের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হবে না।

লেখক : চেয়ারম্যান

সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজ (সিটিএস)

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION